স্বপ্নের শহর মুম্বাই !

প্রতিবেশি দেশ ভারতের জনপ্রিয় শহর মুম্বাই। কি নেই সেখানে? পার্ক,শপিং কমপ্লেক্স, সবজি বাজার এবং সমুদ্র, জুহু বীচ। ভাবতে দারুন না?

মন খারাপ? পা বাড়ালেই সমুদ্র। মুম্বাইবাসিদের কত সুখ তাই না!

এছাড়াও রয়েছে মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়, হাজি আলি, চার্চগেট, বিখ্যাত হোটেল তাজ,গেটওয়ে অব ইন্ডিয়া সহ আরো কত কি…

জাদুর শহর মুম্বাই

আরব সাগরের বুকে খেলা করছে ভরা পূর্ণিমার চাঁদ। রাতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সমুদ্রের গর্জন আর সি লিংকের আলোর ঝলকানি। দিনে সাগরের নীল পানির নির্মল হাওয়ার দোলা আর রাতে আলো-আঁধারিতে মায়ার খেলা। এই জাদুজালে হাজারো মানুষের স্বপ্নকে বাস্তবতায় রূপ দেয় ভারতের ব্যস্ততম শহর মুম্বাই। বিখ্যাত বলিউড স্টার বা ভারতের ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের জীবনের গল্প শুনতে গেলে প্রথমে আসে মুম্বাইয়ের নাম। পকেটে নাম মাত্র রুপি আর চোখভরা স্বপ্ন নিয়ে পা বাড়িয়েছিলেন মুম্বাইয়ের পথে। সময়ের পরিক্রমায় তারা আজ তারাকা ব্যক্তিত্ব। এই গল্প বলিউড তারাকা অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খান থেকে শুরু করে বিশ্বের প্রতাপশালী ব্যবসায়ী মুকেশ আম্বানিরও। রূপে-গুণে মুম্বাইকে বলা হয় অন্নপূর্ণা। পূর্বদিকে মেঘছোঁয়া পাহাড়, পশ্চিমের আরব সাগর আর মাঝের উর্বর ভূমি মুম্বাইকে দিয়েছে পূর্ণতা। বলিউড সিটি মুম্বাইকে দিয়েছে অনন্যতা। ক্রিকেট দুনিয়ার বিস্ময় লিটল মাস্টার শচীন টেন্ডুলকার বেড়ে উঠেছেন, খেলা শিখেছেন মুম্বাইয়ের ওয়াঙখেড়ে স্টেডিয়ামে। আর সাগরপাড়ের এই স্টেডিয়ামই সাক্ষী হয়ে আছে তার আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচের। ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ে নিজের ভাগ্য বদলাতে আসে মানুষ। শুধু চলচ্চিত্র বা বাণিজ্য নয়, প্রকৃতিই মুম্বাইয়ের রূপ-জৌলুস বাড়িয়েছে আপন হাতে। কথায় আছে ‘যাহা নাই ভারতে, তাহা নাই জগতে; যাহা আছে ভারতে তাহা নাই জগতে’। মুম্বাই একাই এই প্রবাদের প্রমাণ। মুম্বাইয়ের মেরিন ড্রাইভ আর সি লিংকের নাম শোনেনি বা ছবি দেখেনি এরকম মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। তাই দিল্লি থেকে মুম্বাইয়ে পথে উড়াল দেওয়ার সময় প্রথম চিন্তা ছিল দুচোখের থ্রি ডি ভার্সনে মুগ্ধতা সৌন্দর্যকে বন্দী করার। মুম্বাইয়ের ছত্রপতি শিবাজী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ছোঁয়ার আগেই পাখির চোখে একপলক দেখে নিই মুম্বাই শহরকে। এরপর আমাদের আবাসস্থল রামাদা প্যালেসে সঙ্গে থাকা জিনিসপত্র রেখেই দে ছুট

জাদুর শহর মুম্বাই
জাদুর শহর মুম্বাই

সাগরের পাড়ে। বাংলাদেশি ১০০ তরুণের ভারত সফরে দিল্লির সঙ্গে এবার মুম্বাই যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তাই আগে থেকেই ভার্চুয়াল জগতে মুম্বাই সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে চোখে দেখার আর তর সইছিল না। ১০০ জনকে তিনটি গ্রুপে ভাগ করে পর্যটকবাহী বাস যখন মুম্বাইয়ের গেট অব ইন্ডিয়ায় পৌঁছল তখন ঘড়ির কাঁটা সাতটা ছুঁই ছুঁই। লাল-মেটে আলোয় গেট অব ইন্ডিয়ার মায়াজাল দুচোখ ভরে দেখব নাকি ক্যামেরাবন্দী করব তা নিয়ে ব্রেনের হাইপো থ্যালামাসে যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল তা অস্বীকার করা যাবে না। স্থাপনার পাশের শিকল ঘেঁষে পেছনে ঘুরতেই শরীরে শিহরণ জাগায় আরব সাগরের শীতল বাতাস। সান বাঁধানো ঘাট আর পাশের কালো পাথরের গায়ে মুহুর্মুহু গর্জনে আছড়ে পড়ছে ঢেউ। সাগরের বুকে জোনাকির আলো জ্বেলে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে সি লিংক রোড। সাগরের বুক চিড়ে স্থল আর জলের সঙ্গম ঘটিয়ে সৌন্দর্যের সার্থক বিকাশ এই স্থাপনা। সাগরপাড় সৌন্দর্যের মেলবন্ধনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তাজমহল প্যালেস হোটেল। গ্রুপ ছবি তোলা শেষে সি লিংক দিয়ে এগিয়ে যায় আমাদের অত্যাধুনিক শকট। কিন্তু মন তো পড়ে আছে আরব্য রজনীর রূপকথায়। সাগরতীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে মুম্বাইয়ের বিখ্যাত ওয়াঙখেড়ে স্টেডিয়াম। তাই পরের দিন আবার আমরা হাজির হই দিনের বেলায়। এখন তো ভোজবাজির মতো পাল্টে গেছে মুম্বাইয়ের চেহারা। পুরোটাই অন্যরকম। ট্রাফিক গ্রিন সিগন্যাল দিলে রাস্তা পার হয়ে দুই মিনিটের হাঁটা পথের দূরত্বে আমরা হাজির হই স্টেডিয়ামের গেটে। খেলোয়াড়দের ড্রেসিং রুম আর বাইরের টাঙানো পোস্টারে ক্রিকেটের জয়গাথা। আইপিএলের জন্য তখন মাঠ প্রস্তুত করতে ব্যস্ত স্টেডিয়ামের কর্মীরা। মাঠ, গ্যালারি— সবই দেখলাম। শুধু অভাব বোধ হলো এত কাছে এসেও ক্রিকেটের বরপুত্র শচীন টেন্ডুলকারকে একপলক দেখতে পেলাম না। মাঠ দর্শন শেষে আমাদের যাত্রা বাস্তব থেকে কল্পনার জগতে। মানে মুম্বাই ফিল্ম সিটি। মেরিন ড্রাইভ দিয়ে সি লিংকে ওঠার আগে সমুদ্রের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে নিজের ঐতিহ্যকে জানান দিচ্ছে ঐতিহাসিক হাজী আলী দরগাহ। তীর থেকে প্রায় এক কিলোমিটার ভিতরে সাগরের মাঝে এই দরগাহ। যাওয়ার জন্য রয়েছে কংক্রিট বাঁধানো সরু রাস্তা। কিন্তু সাগরে যখন জোয়ার আসে তখন ডুবে যায় এই সংযোগ সড়ক। তীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয় দরগাহ। শুধু ভাটার সময়ই দরগাহে যেতে পারেন পর্যটকরা। ১৪৩১ সালে এই দরগাহ তৈরি করা হয়। এটি মুম্বাইয়ে বসবাসকারী মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছে একটি ধর্মীয় আবেগ ও বিশ্বাসের স্থান। এখানে প্রতিদিন মুসলিম ছাড়াও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের হাজার হাজার দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। আগে এতে মহিলাদের নামাজ আদায়ে বিধিনিষেধ থাকলেও সম্প্রতি তা সবার জন্য মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। কালের সাক্ষী ঐতিহাসিক এই দরগাহ সাঈয়েদ পীর হাজী আলী শাহ বুখারী নামে এক মুসলিম ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠা করেন। এক সময় তিনি ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে ধর্মীয় সাধনায় ব্রত হন। কালক্রমে তিনি আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিতি পান। দরগাহে তার কবর রয়েছে। প্রায় দেড় ঘণ্টা মুম্বাই শহরের প্রশস্ত রাস্তা আর হালকা ভিড়-ভাট্টা ঠেলে আমরা পৌঁছাই মুম্বাই ফিল্ম সিটিতে। বাসে বসেই কেউ কেউ ফন্দি আঁটছেন শাহরুখ খান অথবা সালমান খানের সঙ্গে সেলফি তোলার। আর অমিতাভ বচ্চনকে যদি পাওয়া যায় তাহলে তো সোনায় সোহাগা। কিন্তু তাদের কারও দেখা না মিললেও দেখা মিলল অমিতাভ বচ্চন অভিনীত বাগবান সিনেমার সেটের। সবুজ ঘাস আর গগনছোঁয়া গাছের মাঝে পাহাড়ের মাঝে সুন্দর সাজানো-গোছানো ছিমছাম বাড়ি। গাইডের মনোমুগ্ধকর বর্ণনায় দুচোখের পর্দায় তখন চলছে ‘বিগ বি’ আর ‘ড্রিম গার্ল’ হেমা মালিনীর হাসি-আনন্দের চিত্র। কিন্তু দরজা খুলতেই হাসির রোল পড়ে গেল চারপাশে। হ্যাঁচকা লাগানো দরজা খুলে দেখা গেল সেখানে দেয়াল দিয়ে আটকিয়ে শুটিংয়ের অন্য কিছু স্পট সাজানো হয়েছে। মানে বাড়ির আদল থাকলেও তা বাড়ি নয়। এরপরে দেখা মিলে অধিকাংশ সিনেমায় নায়িকার কান্নায় স্বামীকে বাঁচানোর জন্য দেবীর কাছে প্রার্থনা করছেন, কখনোবা নববধূর কপালে রক্তলাল সিঁদুর পরিয়ে দিচ্ছেন নায়ক। আবার নায়কের মুষ্টিবদ্ধ প্রতিজ্ঞা এবং সততায় সন্তুষ্ট হয়ে মনোবাসনা পূরণ করছেন দেবী। বিষয় হলো এই যে প্রতিনিয়ত ঘটনাপ্রবাহ আমরা দেখছি তার সবই চিত্রায়ণ এই একই মন্দিরে। শুধু অভিনয়ের সময় মন্দিরের আদলে বানানো এই সেটে স্থাপন করা হয় প্রতিমা। কাহিনী অনুযায়ী স্থাপিত হয় দেবী মূর্তি। এরকম হাজারো জীবনের গল্পকে চলচ্চিত্রে রূপ দিয়ে তারকা তৈরি করছে এই ভূমি। বলিউড তারকা এবং আগ্রহীদের কাছে এটা স্বপ্নের আরেক নাম। তাই তো মুম্বাইকে বলা হয় স্বপ্নের আঁতুড় ঘর আর বাস্তবায়নের পটভূমি।

Related Post: Dhaka to Kolkata Air Ticket Price

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *